রমজান ২০২০।মহানবীর রমজানের আমল।বিশ্বনবী (সা.) রোজা এলে ৭টি কাজকে বেশী গু...





রমজান এলে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম
৭টি কাজ গরুত্বসহকারে অবশ্যই করতেন

আসসালামু আলাইকুম সম্মানিত সুধী আজ কয়েক মিনিটে জেনে নিব বিশ্বনবী (দঃ) মহান বরকতময় মাস রমজান কিভাবে কাটাতেন- আশা করি আপনার জীবনের কয়টি মিনিট এই অডিওটি শুনলে আপনি অনেক কিছু জানতে পারবেন এবং রমজানে আপনার জন্য কাজে আসবে।

সৈয়্যদা আয়শা সিদ্দিকা (রাঃ) এরশাদ করেন (কানা রাসুলুল্লাহে ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম এয়াজতাহিদু ফি রামাদানা মালা এয়াজতাহিদু ফি গাইরিহি)
অথ্যাৎ রমজান এলে নবী আঃ এবাদতে এত বেশী মেহনত করতেন, রমজান ব্যতীত অন্যান্য মাসে এত মেহনত করতেন না। (মুসলিম)
বায়হাকি অপর একটি হাদীস- সৈয়দা আয়শা সিদ্দিকা (রাঃ) এরশাদ করেন (কানা রাসুলুল্লাহে (সা.) ইজা দাখালা রামদান )যখন রমজানের মাস আসত নবী (আঃ) নিজের কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন (ছুম্মা লাম এয়াতি ফিরাশাহু) অতঃপর গোটা মাস অতিক্রম না হওয়া পযন্ত নিজের বিছানায় ফিরে আসতেন না।
বায়হাকি অপর হাদীস- (কানা ইজা দাখালা রামাদান তাগাইয়্যারা লাউনুহু) যখন রমজান প্রবেশ করত নবীজির চেহেরার রং পরিবর্তন হয়ে যেত।(ওয়া কাছুরাত সালাতুহু) বেশী বেশী নফল নামাজ পড়তেন, (ওয়াবতাহালা ফিদ দুয়ায়ে ওয়া আশফাকা লাউনুহু) এবং দোয়ার মধ্যে এত বেশী কাকুতি মিনতি করতেন হুযুরের চেহেরায়ে আনোয়ার লাল হয়ে যেত।

রমজান মাসে আল্লাহর আনুগত্য পালন, ইবাদত-বন্দেগি ও নেকির কাজে অগ্রণী থাকার অনুপম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)। রমজানের শুরুতেই তিনি সাহাবিদের রমজান আগমনের সুসংবাদ দিতেন। রমজান মাস ও রোজার বিশেষত্ব তাদের কাছে তুলে ধরতেন; যাতে করে মানসিকভাবে তারা ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মাঝে রমজান এসেছে; এক মোবারকময় মাস এসেছে। আল্লাহ আপনাদের ওপর এ মাসের রোজা পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আসমানের দুয়ারগুলো খোলা রাখা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ রাখা হয়। এ মাসে চরম দুষ্ট শয়তানগুলোকে শিকল পরানো হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, সে আসলেই বঞ্চিত।’ (নাসাঈ : ২১০৬)।

শাবান মাসের ২৯ তারিখে নবী করিম (সা.) চাঁদ দেখার নির্দেশ দিতেন; চাঁদ দেখা গেলে রোজা রাখার ঘোষণা দিতেন। চাঁদ দেখা না গেলে কিংবা আকাশে মেঘ থাকলে শাবান মাসের মেয়াদ ৩০ দিন পূর্ণ করে এরপর রমজান শুরু করতেন। সন্দেহের দিন রোজা রাখতেন না। তিনি বলেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙ। আর যদি চাঁদ না দেখ; তাহলে শাবান মাসের মেয়াদ ৩০ দিন পূর্ণ কর।’ (বোখারি ও মুসলিম)। আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) বলতেন, ‘যে দিনের ব্যাপারে লোকেরা সন্দেহে থাকে, সে দিন যে ব্যক্তি রোজা রাখল সে আবুল কাসেম (নবী সা.) এর অবাধ্য হলো।’ (সুনানে তিরমিজি)।
পুরো রমজান তিনি সিয়াম ও কিয়ামের মাঝে অতিবাহিত করতেন। সাহরি খেয়ে রোজা শুরু করতেন, ইফতার করে রোজা ভাঙতেন। সূর্য ডোবার পর মাগরিবের নামাজের আগে ইফতার করতেন এবং ফজরের আজানের কিছু সময় আগে সাহরি খেতেন। সময় হয়ে গেলে অবিলম্বে ইফতার করতেন, পক্ষান্তরে শেষ রাতে বিলম্বে সাহরি খেতেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ তত দিন কল্যাণে থাকবে, যত দিন তারা অবিলম্বে ইফতার করবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। জায়েদ বিন সাবেত (রা.) বলেন, ‘আমরা নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে সাহরি খেলাম, এরপর তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। (রাবি বলেন) আজান ও সাহরির মাঝে কতটুকু সময় ছিল? তিনি বলেন, ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করার মতো সময়।’ (বোখারি)। সাহরি খাওয়াকে তিনি বরকত লাভের মাধ্যম জানতেন। আবদুল্লাহ বিন হারেছ এক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, ‘আমি রাসুল (সা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি সাহরি খাচ্ছিলেন এবং বলেন, সাহরি হচ্ছে বরকত; যা আল্লাহ তোমাদের দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সাহরি খাওয়া বাদ দিও না।’ (নাসাঈ : ২১৬২)।
তাঁর ইফতার ও সাহরি সাধারণ মানের খাবার ছিল; কোনো আড়ম্বরপূর্ণ খাদ্য ছিল না। তাঁর ইফতার ও সাহরির মূল উদ্দেশ্য ছিল উপবাস শুরু ও বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না পেতেন; শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। শুকনো খেজুর না পেলে কয়েক ঢোক পানি পান করে ইফতার করতেন।’ (সুনানে তিরমিজি)। তিনি বলেন, ‘মোমিনের সাহরির জন্য খেজুর কতই না উত্তম!’ (আবু দাউদ : ২৩৪৫)।
ইফতারের সময় মহানবী (সা.) দোয়া করতেন এবং দোয়া করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয় নাÑ ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না তিনি ইফতার করেন এবং মজলুমের দোয়া।’ (সুননে ইবনে মাজাহ, আরনাউত-হাসান)। নবী করিম (সা.) ইফতার করে বলতেন, ‘জাহাবাজ জামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ’ (অর্থ- তৃষ্ণা দূর হয়েছে, শিরাগুলো সজীব হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব সাব্যস্ত হয়েছে)। (সুনানে আবু দাউদ : ২৩৭৫, হাসান)।
রোজা রেখে তিনি মিসওয়াক করতেন। তিনি সারা দিনই মিসওয়াক করতেন। বিশেষ করে অজু করার সময়। আমের বিন রাবিয়া থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.) কে রোজা অবস্থায় অসংখ্যবার মিসওয়াক করতে দেখেছি।’ (সুনানে তিরমিজি : ৭২৫)। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন মনে না করতাম তাহলে প্রতিবার অজুকালে তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৯৯৩০)। এ হাদিসের বিধান সাধারণ; রোজাকালীন অবস্থাকে এর থেকে বাদ দেয়া হয়নি, যেমনটি বলেছেন ইমাম বোখারি।
মহানবী (সা.) রমজানের রাতের বেলা নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির-আজকারে অতিবাহিত করতেন এবং কিছু সময় নিদ্রা যেতেন।
ইবনে হাজার বলেন, ‘নবী করিম (সা.) উল্লেখ করেছেন, ‘রমজানের কিয়াম দ্বারা উদ্দেশ্য তারাবির নামাজ।’ অর্থাৎ তারাবির নামাজ পড়লে এর দ্বারা কিয়াম আদায় হবে;।’
নবী করিম (সা.) দীর্ঘ সময় ধরে কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজ আদায় করতেন। নুমান বিন বাশির (রা.) বলেন, ‘একবার আমি নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে ২৩ রমজানে কিয়াম আদায় করলাম, তিনি রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামাজ পড়লেন। এরপর ২৫ রমজানে তাঁর সঙ্গে কিয়াম করলাম অর্ধরাত পর্যন্ত। এরপর ২৭ রমজানে তাঁর সঙ্গে কিয়াম করলাম; আমরা ভেবেছিলাম, সে রাতে আমরা ‘ফালাহ’ খেতে পারব না। তারা সাহরিকে ফালাহ বলত।’ (সুনানে নাসাঈ : ১৬১৬)।
কখনও কখনও এক রাকাতে সূরা বাকারা, নিসা ও আলে ইমরান তেলাওয়াত করতেন, যেমনটি হুজাইফা (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে। (সহিহ ইবনে খুজাইমা : ৬৮৪)। তবে তিনি গোটা রাত ইবাদতে কিংবা তেলাওয়াতে কাটাতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) এক রাতে গোটা কোরআন খতম করেছেন, কিংবা ভোর পর্যন্ত গোটা রাত নামাজ পড়েছেন কিংবা রমজান ছাড়া পুরো মাস রোজা রেখেছেনÑ এমনটি আমি জানি না।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৪২৬৮)।

রমজানের প্রতি রাতে তিনি জিবরাঈল (আ.) কে কোরআন তেলাওয়াত শোনাতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘জিবরাঈল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে মাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করত। নবী করিম (সা.) তার কাছে কোরআন পাঠ উপস্থাপন করতেন।’ এভাবে জিবরাঈল (আ.) এর সঙ্গে রমজান মাসে একবার কোরআন খতম করতেন। যে বছর নবী করিম (সা.) মারা যান, সে বছর তিনি দুইবার খতম করেন। ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘তেলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্তরের উপস্থিতি ও বোঝা।’ (ফাতহুল বারি : ৯/৪৫)।

রমজানের শেষ ১০ রাত নবী করিম (সা.) আরও বেশি পরিশ্রম করতেন, আরও অধিক ইবাদতে মশগুল হতেন। নিজের পরিবার-পরিজনকে ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। তিনি কোমর বেঁধে লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশা নিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। শেষ ১০ রাতের বেজোড় রাতগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেন, ‘...শেষ ১০ বেজোড় রাতে সেটাকে (লাইলাতুল কদর) অন্বেষণ করো।’ (ইবনে মাজাহ : ১৭৬৬)।

নবী করিম (সা.) স্বভাবতই বদান্য মানুষ ছিলেন। এ মাসে তাঁর বদান্যতা আরও বেড়ে যেত। বিশেষ করে যখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা দুইজন একত্রে কোরআন অধ্যয়ন করতেন, এ সাক্ষাৎ তাঁর বদান্যতার ওপর প্রভাব ফেলত। এ সময় তিনি মুক্ত হাওয়ার চেয়েও অধিক বদান্য হতেন মর্মে সহিহ বোখারি (৬) ও সহিহ মুসলিমের হাদিসে (৫০) এসেছে। রমজান মাসে তিনি ব্যাপক দান-সদকা করতেন।





নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করতেন। এ সময় তিনি আল্লাহর ইবাদতে মসজিদে নির্জন বাস করতেন। দুনিয়াবি সব ধরনের সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতেন, ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) তাঁর মৃত্যু অবধি রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করতেন।’ (বোখারি : ২০২৬)। তাঁর ইতেকাফের জন্য মসজিদে একটি তাঁবু পাতা হতো। ইতেকাফকালীন তিনি রোগী দেখতে বের হতেন না, জানাজায় যেতেন না এবং নারীদের সংশ্রব ত্যাগ করতেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজনের মতো জরুরি কিছু ছাড়া তিনি তাঁর ইতেকাফস্থল ত্যাগ করতেন না।

কোন মন্তব্য নেই

borchee থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.