জুমা খুতবা। কান্নার ওয়াজ। সাহাবাদের নবী প্রেমের শ্রেষ্ঠ ১০টি ঘটনা। Jumma...
নবী প্রেমের দুনিয়াবি ও আখেরাতের উপকারিতা
নবী প্রেমের ১৫টি আযব ঘটনা
(কুল ইন কুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিউনি ইউহবিবকুমুল্লাহ)
নবীকে কেন ভালবাসতে হবে?
সন্তান-সন্তুতি, মা-বাবা তথা নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে যাকে; তিনি হলেন হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কেন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এতবেশি ভালোবাসতে হবে? এ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাই বা কী?
হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই এ ‘কেন ভালোবাসতে হবে’-এর উত্তর দিয়েছেন সুস্পষ্টভাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এতটা ভালোবাসার নামই ‘ঈমান’। তাতে মুমিন মুসলমানের ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে। হাদিসে এসেছে-
হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সেই আল্লাহর শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না; যতক্ষণ না আমি তার নিজের জীবনের চেয়ে, তার বাবা-মা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালোবাসার পাত্র হই।’ (বুখারি)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ ও অনুকরণ করা। আর এর মাধ্যমেই মুমিন বান্দার জন্য দুনিয়া ও পরকালের সফলতা লাভ করা। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা এ ভালোবাসার কথাই তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। [ সুরা ইমরান ৩:৩১ ]
قُلْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَالرَّسُولَ فإِن تَوَلَّوْاْ فَإِنَّ اللّهَ لاَ يُحِبُّ الْكَافِرِينَ
বলুন, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তুতঃ যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফেরদিগকে ভালবাসেন না। [ সুরা ইমরান ৩:৩২ ]
وَأَطِيعُواْ اللّهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
আর তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রসূলের, যাতে তোমাদের উপর রহমত করা হয়। [ সুরা ইমরান ৩:১৩২ ]
يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعْ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। [ সুরা আহযাব ৩৩:৭১ ]
وَأَطِيعُواْ اللّهَ وَرَسُولَهُ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
আর আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক। [ সুরা আনফাল ৮:১ ]
রূহের খোরাক কি?
মানুষ মনে করে তার শরীরের চাহিদা পুরণ হলেই সে সুখ পাবে, কিন্তু শরীরের চাহিদা পুরণ হলেই মানুষ সুখী হতে পারেনা, কারন মানুষের শারিরিক খোরাক পুরণের পাশা পাশি অন্য একটি খোরাপ পুরণ করা খুবই জরুরী তা হল রূহের খোরাক।
আর রূহের খোরাক যদি মানুষ পুরণ করতে পারে তাহলে সে প্রকৃত সুখী হতে পারে।
আর রূহের খোরাপ কি?
ইবনে কাইয়্যেম মাদারেকুস সালেকিন নামক কিতাবে, ইমামে কাস্তুলানি মাওয়াহেবে লাদুনিয়াতে লিখেছেন, যুরকানি- যুরকানি আলাল মাওয়াহেবে বয়ান করেছেন
মানুষ যদি স্থায়ী সুখ শান্তি চায় তাহলে তাঁকে তাঁর পিপাসার্থ রূহের খোরাক দিতে হবে, আর রূহের খোরাক হল (কুতুল কুলুব ওয়া কুররাতুল উয়ুন ওয়া আজাউল আরওয়াহ)
তারা বলেন রূহ দৌলত চায়না, খাদ্য চায়না, পানিয় চায়না, রূহ ইজ্জত চায়না, সম্মান চায়না, রূহ একমাত্র একটি জিনিষ চায়, রূহের একমাত্র খোরাক হল এশকে মোস্তফা।(সুবহানাল্লাহ)
প্রত্যেকের রূহ আলমে আরওয়াতে
মোস্তফার দিদার করেছিল
প্রত্যেক রূহ আলমে আরওয়াহতে হুযুর (দ) এর মিলিত হয়েছিল, হুজুরের দিদার করেছিল, সে দিদারের পর আজ পর্যন্ত আপনার আমার প্রত্যেকের রূহ সে মোস্তফার দিদারের জন্য ছটফট করে আসছে, সে জন্য রূহের আসল খোরাক হল ইশকে মোস্তফা, দিদারে মোস্তফা, তাই রূহকে শান্তি দিতে হলে দরুদ সালাম বৃদ্ধি করে দিতে হবে, নবীর প্রতি বেতাহাশা ইশক ভালোবাসা বৃদ্ধি করে দিতে হবে।
রূহকে এশকে মুস্তফা দিয়ে দিন, একে মাহবুবের প্রতি মহব্বতের চিহ্ন দেখিয়ে দিন, আর যার রূহ এশকে মোস্তফা পেল সে আর কোন কিছু পরোয়া করে না,
সে নবীর সুন্নত পালন করে নির্দিধায়, কে কি বলছে তার পরওয়া নাই, ব্যবসায় উন্নতি হচ্ছে কি হচ্ছেনা পরওয়া নাই, দাড়ি রেখে দিয়েছে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখছে তার কোন পরওয়া নাই। কারন এখন তার রূহ নবীর এশকে মুহব্বতে শান্ত হয়ে গেছে।তার দুনিয়ার আর কোন লোভ লালসা বাকি থাকেনা।
এশকে মোস্তফার ১৫টি হৃদয়কারা ঘটনা
১. আবু বসিরের ইশকে মোস্তফা
হুদায়বিয়ার সন্ধির জন্য শর্ত নির্ধারণ হয়ে গেল। শর্তসমূহের মধ্যে একটি শর্ত ছিল, কাফেরদের মধ্যে থেকে যদি কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে মদিনায় আশ্রয় নেয় তাহলে মুসলমাগণ তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। আর যদি আল্লাহ না করুন, কোন মুসলমান মুরতাদ হয়ে মক্কায় চলে আসে তাহলে মক্কাবাসী তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে না।
এর কিছুদিন পর আবু বসির নামক এক সাহাবী মুসলমান হয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনায় হাজির হলেন। কাফেররা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুইজন ব্যক্তিকে মদীনায় রাসূল ﷺ এর নিকট পাঠাল। রাসূল ﷺ চুক্তি মোতাবেক তাঁকে আগত দুইজন কাফেরের হাতে সোপর্দ করলেন। আবু বসির বলতে লাগলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মুসলমান হয়ে আপনার কাছে আসলাম, আপনি আমাকে তাদের হাতে সোপর্দ করছেন? রাসূল ﷺ তাঁকে ধৈর্য্য ধারণ করার উপদেশ দিলেন এবং বললেন অনতিবিলম্বে তোমার জন্য আমার ডাক আসবে তোমার রাস্তা খুলবে।
আবু বসির চলে যাওয়ার পর হুযুর (দ) এই আশেকে রাসুলের জন্য দোয়া করলেন কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেন, আল্লাহ আবু বসিরকে তুমি রক্ষা করা তাকে সাহায্য কর।
আবু বসীর দুই কাফেরের সাথে ফিরে যাচ্ছেন। আর বার বার পিছনে ’ফিরে তাকাচ্ছিলেন, সকল সাহাবী কাঁদছিলেন- তারা যখন চোখের আড়াল হয়ে গেল আল্লাহর নবী কাঁদতে কাঁদতে জমিনে বসে গেলেন।
চলতে চলতে এক পর্যায়ে এক কাফেরকে বলল, বন্ধু! তোমার তলোয়ারটাতো খুব উন্নত মনে হচ্ছে। কিছু কিছু মানুষ এমন থাকে যারা সামান্য সুনাম শুনেই গলে যায়, ফুলে যায়। লোকটি তলোয়ারটা খাপ থেকে বের করে বলতে লাগল আমি অনেক শত্রুর উপর এটাকে সফল প্রয়োগ করেছি। তুমি হাতে নিয়ে দেখ, তাহলে তুমিও বুঝতে পারবে।
আবু বসীর তলোয়ারটা হাতে নিয়ে সেই কাফেরের উপরই সফল প্রয়োগ করলেন অর্থাৎ তাকে হত্যা করলেন। অন্য কাফেরটি এই অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল। সে বুঝল- আমার সঙ্গীটিকে হত্যা করা হয়েছে এবার আমাকেও হত্যা করা হবে তাই সে পালিয়ে গেল।
হযরত আবু বসীর মদীনা থেকে দুরে সাগরের পাশে এক জায়গায় আস্তানা তৈরি করলেন।
মক্কাবাসীদের যখন এই ঘটনা জানা হলো তখন আবু জান্দালও লুকিয়ে আবু বসীরের সাথে মিলিত হলেন। এমনিভাবে যেই মুসলমান হতো সেই আবু বসীরের দলে যোগ দিত। কারন হুদায়বিয়ার চুক্তি মত তারা মদীনায় যেতে পারতনা, ধীরে ধীরে আবু বসীরের দলে ৩০০ জন জমা হল। সেখানে তাদের কোন খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। চাষাবাদেরও কোন সুযোগ ছিলো না। যার কারণে কত কষ্টে যে তাদের দিনাতিপাত হয়েছে তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।
কাফেরেরা আবু বসিরকে বলত তোমরা যার কলমা পড়েছ সেও তোমাদের আশ্রয় দিচ্ছে না, তখন আবু বসির জবাব দেন, আমরা সে নবীর জন্য কুরবান, তিনি আমাদের ধৈর্য্য ধারনের জন্য বলেছেন আমরা ধৈর্য্য ধারন করব, এবং তিনি বলে দিয়েছেন একদিন আমাদের ডেকে নিবেন সে দিনের জন্য অপেক্ষা করছি, কেননা আমার দয়াল নবীর জবান থেকে যা বের হয় তা তিনি পালন করেন এটাই আমাদের ঈমান।
তবে মক্কার যেই জালেমদের জুলুমের কারণে তাদের এই কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল, সেই কাফেরদের তারা নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। মক্কার যেই কাফেলাই ব্যবসার কাজে এই পথ দিয়ে যেত, আবু বসীরের দল তাদের উপর হামলা করত। ফলে মক্কার কোরাইশদের এই পথে যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল।
মক্কার কোরাইশরা অতিষ্ট হয়ে মদীনায় রাসূল ﷺ এর নিকট প্রতিনিধি প্রেরণ করলো। তারা রাসূল ﷺ এর নিকট কাকুতি মিনতি করে এবং আল্লাহ ও আত্মীয়তার দোহায় দিয়ে অনুরোধ করলো, রাসূল ﷺ যেন আবু বসীরের জামাতকে মদীনায় ডেকে নেন এবং চুক্তিনামা থেকে মুসলমানদের ফেরত দেয়ার শর্ত মওকুফ করে দেন। যাতে করে তাদের যাতায়াতের রাস্তা খুলে যায়।
রাসূল ﷺ তাদের এই অনুরোধ গ্রহন করলেন। তিনি আবু বসীরসহ সকলকে মদীনায় প্রবেশ করার অনুমতিপত্র লিখে আবু বসীরের নিকট প্রেরণ করলেন।
তখন আবু বসিরের সাখারাত চলছিল, আবু বসিরকে সকলেই বলল এটা তোমার শেষ সময় কিন্তু আবু বসির বলেন আমার নবী আমাকে কথা দিয়েছেন তিনি আমাকে ডাকবেন তার ডাক যতক্ষন আসবেনা ততক্ষন আমার মৃত্যু হবেনা, তোমরা দেখিও, আমার নবী আমাকে ডাকা পাঠাবেন।
ঠিকই হুযুরের লিখিত এই অনুমতিপত্র যখন আবু বসীরের হাতে গিয়ে পৌছাল তখন তিনি মৃত্যু শয্যায়। রাসূল ﷺ এর চিঠি হাতে তিনি উচ্চস্বরে তকবীর দিতে লাগলেন আর উচ্চস্বরে কলমা পড়তে পড়তে তিনি ইন্তেকাল করলেন। (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)
এটাই হল সাহাবাদের ঈমান, হুজুরের প্রতি আকিদা, ইশক মহব্বত।
২. মসজিদে নববীতে উঁচু আওয়াজ না করা
হযরত সায়েদ বিন এজিদ বলেন একদিন আমি মসজিদে নববীর কোনায় বসা ছিলাম তখন কেহ একজন আমাকে কংকর নিক্ষেপ করল আমি ফিরে দেখলাম তিনি ছিলেন হযরত ওমর (রা) আমি তখন উঠে উনার কাছে চলে গেলাম, তখন আমি প্রশ্ন করলাম এয়া আমিরুল মুমিনিন আপনি আমাকে কংকর কেন মেরেছেন? তখন তিনি বললেন ঐ যে দুরে ২ জন লোক বসে আছে আর মসজিদে নববীতে হুযুরের রওজায় এসে উঁচু আওয়াজে কথা বলছে তাদের ডেকে আন।
আতি তাদের ডেকে ওমরের কাছে নিয়ে আসলাম, তখন হযরত ওমর (রা) বললেন তোমরা কোথাকার বাসিন্দা? তারা বলল আমরা তায়েফ থেকে এসেছি। ওমর (রা) বললেন যদি তোমরা মদীনার বাসিন্দা হতে তাহলে আজ আমি তোমাদের শাস্তি দিতাম। তোমরা উঁচু আওয়াজে কথা বলছ জাননা এটা রাসুলুল্লাহর মসজিদ?
হুজুরের ইজ্জত তখনও ছিল এখনও আছে কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
৩. ইমাম মালেকের কিতাবের শব্দ ইশকে মোস্তফা
মদীনার লোকেরা ইমাম মালেক (রহ) এর মাযহাব মানেন, তিনি একজন সাচ্চা আশেকে রাসুল ছিলেন, যারা কথায় কথায় বলেন দলিল কোথায়? তাঁদের জন্য ইমাম মালেক (রহ) এর ইশকে মুহব্বতের ছবক রয়েছে।
হযরত ইমামে মালেক হুজুরের রওজার পাশে বসে ৪০ বছর হাদিসের দরস দিয়েছৈন এই ৪০ বছরে তিনি কিতাবের পাতা উল্টানোর আওয়াজ পযন্ত হতে দেননি।
# ইমাম মালেক মদীনায় খালি পায়ে চলাফেরা করতেন,
নবীর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার জন্য কুরআন হাদীসের দলিলের প্রয়োজন নাই, জায়েজ পন্থায় মহব্বত প্রকাশ করা যায়, ইমাম মালেক একজন মুজতাহিদ এবং একজন শ্রেষ্ঠ মুফতি ছিলেন, মদীনা পাকে খালি পায়ে হাটা চলা করার ব্যপারে তিনি কুরআনের দলিল হাদিসের দলিল কিংবা সাহাবাদের আমল তালাশ করেননি। বরং নবীর প্রতি ইজ্জত সম্মান দেখিয়েছেন বিনা দলিলে। সুবহানাল্লাহ।
৪. কদু হুজুরের পছন্দের খাদ্য
খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে দাওয়াতে হযরত ইমাম মালেকও ছিলেন একজন দাওয়াতে খাবার খেতে খেতে বলল আমি কদু পছন্দ করিনা তখন ইমাম মালিক তরবারি বের করে বলল যা রাসুলুল্লাহর পছন্দ তা তোমার পছন্দ না বলার অধিকার কে দিয়েছে?
এটাই ছিল হুজুরের প্রতি মহব্বত ভালোবাসার চিহ্ন।
৫. আসলাহ বিন শুরাইক (রা)
উনার কাজ ছিল হুজুর যখন কোথাও সফরে বের হতেন সওয়ারির সিট হযরত আসলাহ বিন শুরাইক বেঁধে দিতেন, একদিন ভোর রাতে হুজুর সফরে বের হওয়ার কথা হযরত আসলাহ বিন শুরাইক অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন তাই শীতের রাতে পানি গরম করে গোসল সেরে হুজুরের দরবারে গিয়ে দেখেন হুজুরের কাফেলা বের হয়ে গেছে, হযরত আসলাহ দ্রুত ঘোড়া দৌড়িয়ে হুজুরের পাশে পৌঁছলেন হুজুর আসলাহকে দেখে মুচকি হাসলেন আর বললেন আসলাহ আজ আমার সওয়ারির সিট তুমি বাঁধনি মনে হয়, তখন আসলাহ বলল এয়া রাসুলাল্লাহ আমি পবিত্র ছিলামনা তাই পবিত্রতা অজন করতে দেরী হয়ে গেছে, আর আমি পছন্দ করিনা আপনার সওয়ারীর সিটটা আমি অপবিত্রতা অবস্থায় ধরি। সুবহানাল্লাহ
সাহাবায়ে কেরাম এর হুজুরের ইজ্জত সম্মান মহব্বতের রং রূপ এমনই ছিল।
৬.আল্লামা জামির রাসূল প্রেমে ৮৭৭ হিজরী
(জিবনে হবে কি তোমারী দিদার এয়া রাসুলাল্লাহ সুরে)
Tanam Farsooda Jaan Para Ze Hijra, Ya Rasulallah
তানাম ফারছুদা জা পারা জি হিযরা, এয়া রাসুলাল্লাহ
তানাম মানে হল শরীর, হুযুর যেভাবে মাছ পানি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে ছটফট করে আমিও আপনার বিরহে ছটফট করছি
Dillam Paz Murda Aawara Ze Isyaa, Ya Rasulallah
দিলাম পাজ মুরদা আওয়ারা জি ইছিয়া, এয়া রাসুলাল্লাহ
গুনাহ করতে করতে আমার অন্তর মরে গেছে এখন কোন মুখে আমি আপনার সামনে হাজির হব?
Choon Soo’e Mun Guzar Aari, Manne Miskeen Zanaa Daari
চু ছুয়ে মন গুজার আরি, মনে মিচকিজে না দারি
হুযুর যদি আপনি আমার কুঁড়ে ঘরে তশরীফ আনেন, আমি মিসকিন আমি গরীব কি দিব আপনার শানের উপযুক্ত আমার কাছেতো কিছু নাই
Fida-E-Naqsh-E-Nalainat Kunam Ja, Ya Rasulallah!
ফেদায়ে নকশে নালায়নত কুনাম জা, এয়া রাসুলাল্লাহ
হুযুর যদি আপনি আমার কুঁড়ে ঘরে তশরীফ আনেন আমি আপনার জন্য কিছু একটা করব, তবে আমি আপনার মাথা মোবারকের জন্য নয়, আপনার কপাল মোবারকে জন্য নয়, আপনার নুরানি চেহেরার জন্য নয়, আপনার শরীর মোবারকের জন্য নয়, আপনার কাপড় মোবারকের জন্য নয়, আপনার কদম মোবারকের জন্য নয়, আপনার জুতা মোবারকের জন্য নয় বরং আপনি যেখানে দাঁড়াবেন সেখানে আপনার জুতা মোবারকের যে চিহ্ন পড়বে সে জুতার চিহ্নের জন্য আমি আমার জান কুরবান করে দিব।
এ পৃথিবী থেকে এমন অনেক মহামনীষী চলে গেছেন, যাঁরা ছিলেন রাসূলের একনিষ্ঠ আশেক। তাঁরা পৃথিবীর বুকে রাসূল প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিশিষ্ট্য ফরাসী কবি আবদুর রহমান ইবনে আহমদ মোল্লা জামী (রহ.)।
কবি আবদুর রহমান জামী (রহ.) একদা মনের মাধুরী মিশিয়ে এক কালজয়ী কবিতা রচনা করেন। তাঁর সেই কবিতার বিষয়বস্তু ছিলো খুবই উঁচু মানের। রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর শানে তিনি এ কবিতা রচনা করেন। তাঁর কবিতায় ছিলো রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসার নিদর্শন। কাব্য-ছন্দে তিনি রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর দৈহিক সৌন্দর্য, বড়ত্ব, মহত্ত্ব, উদারতা, বদান্যতা, নম্রতা, ভদ্রতা প্রভৃতি সুমহান চারিত্রিক গুণগুলোকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। রাসূলু (দঃ)-এর পাহাড়ের মতো অবিচল সাহস, আকাশের মতো বিশাল উদার হৃদয়, সমুদ্রের মতো গতিশীল চেতনা, পাথরের মতো মজবুত ব্যক্তিসত্তা ইত্যাদি অনুপম গুণ ও আদর্শের কোনটাই এতে বাদ দেননি তিনি। তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রেই প্রিয়নবী (দঃ)-এর প্রতি গভীরতম ভালোবাসার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। যা নিখুঁত রাসূল প্রেমের এক অপূর্ব উদাহরণ।
রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর শানে সেই প্রেমমাখা কবিতা রচনা করার পর রাসূল প্রেমে আত্মাহারা এ মহান বুযুর্গ বারবার এটি আবেগজড়িত কণ্ঠে আবৃত্তি করে রাসূলের প্রতি গভীর ভালোবাসার আত্মপ্রকাশ ঘটাতেন। তখন তাঁর চোখ থেকে মুক্তদানার ন্যায় অশ্রুধারা প্রবাহিত হত।
৮৭৭ হিজরীর ঘটনা। একদা তিনি মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়ে হজ্বের যাবতীয় কাজ শেষে ভাবলেন, রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর রওজা মুবারকের সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্বরচিত কবিতাখানা পাঠ করবেন। হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে তা রাসূলুল্লাহ (দঃ)কে শুনাবেন। প্রেমের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন এই কবিতার ভক্তিপূর্ণ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে।
এ কথা মনস্থ করে আল্লামা জামী (রহ.) মদীনার পথে পা বাড়ালেন। এদিকে মক্কার তৎকালীন শাসক স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন-স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (দঃ) তাকে বলছেন, ‘আবদুর রহমান জামীকে মদীনায় আসতে দিও না। যেকোন উপায়ে তাকে মদীনায় আসতে বারণ কর।’
পরদিন সকালে শাসক সেই জামী (রহ.)কে খোঁজ বের করে আনার জন্য লোক পাঠালেন। লোকদেরকে তিনি বলে দিলেন, ‘তোমরা তাকে মদীনায় যেতে নিষেধ করবে।’
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে লোকজন জামী (রহ.)-এর সাক্ষাৎ পেলেন। তারা তাকে মক্কার শাসনকর্তার, নিষেধাজ্ঞার কথা জানালেন। একথা শুনে জামী (রহ.) বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, তাহলে কি আমার আশা পূর্ণ হবে না! এতদিনের স্বপ্ন কি আজ ধুলোয় মিশে যাবে! আমি এমন কী অপরাধ করেছি? তিনি সেই লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি এই নিষেধাজ্ঞার কারণ জানেন? তারা বললেন-না, শুধু নিষেধাজ্ঞা শুনিয়ে দেয়ার জন্য আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তখন রাসূল প্রেমিক এই যুবক অনেক চিন্তা-ভাবনা করলেন। কিন্তু নিশেধাজ্ঞার কোন কারণ বের করতে সক্ষম হলেন না।
তিনি সীমাহীন অস্থিরতায় ভুগছেন। কোন কিছুই ভালো লাগছে না তাঁর। রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর দেশে এসে তাঁর রওজা মুবারক যিয়ারত না করেই ফিরে যাবেন বা রাসূলুল্লাহ (দঃ)-এর প্রতি সালাম পেশ না করেই আপন নীড়ে প্রত্যাবর্তন করবেন? তা হয় কি করে? এভাবে চিন্তা করতে করতে তাঁর পেরেশানী আরও বাড়তে লাগলো।
লোকজনের কথায় কিছুদূর ফিরে যাবার পর তার মনোভাব পাল্টে গেল। কারণ, যার হৃদয়ের সমস্ত অংশই রাসূলের প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর; যিনি রাসূলের ভালোবাসায় নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, তিনি কেমন করে রাসূলের রওজার কাছে এসেও যিয়ারত না করে থাকতে পারেন? শব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হলেও তাকে মদীনায় যেতেই হবে। প্রয়োজনে জেলে-জুলুম যাই আসুক, তা অম্লান বদনে সহ্য করবেন। অন্যথায় তার অশান্ত মনের আগুন কিছুতেই নিভবে না।
এবার তিনি কাফেলা থেকে আলাদা হয়ে পাহাড়-পর্বতের পথ ধরে এগিয়ে চললেন। এদিকে মক্কার শাসনকর্তা আবারও স্বপ্নে দেখলেন, নবী করীম (দঃ) তাকে বলছেন, ‘জামী কিন্তু তোমার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলছে।’
এবার মক্কার শাসক লোক পাঠিয়ে জামী (রহ.)কে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন এবং কয়েদখানায় আবদ্ধ করে রাখেন। তখন শুরু হয় তাঁর বন্দী জীবন।
তৃতীয়বার আমীরে মক্কা স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ (দঃ) তাঁকে বলছেন-হে মক্কার শাসক! তুমি একি করলে? তুমি আমার জামীকে বন্দী করেছ? সে তো এমন কোন অপরাধ করেনি যে, তুমি তাকে জেলখানায় বন্দী করে কষ্ট দিতে পার! আমি তো তোমাকে বন্দী করতে বলিনি। আমি বলেছিলাম তাকে মদীনায় আসতে বারণ করতে। তুমি তাকে বন্দী করে কষ্ট দিলে কেন? মনোযোগ সহকারে কান পেতে শুন, জামী আমার আশেক, তার হৃদয় আমার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আমাকে ছাড়া সে কিছুই বুঝে না। আমি ব্যতীত তার জীবন যেন অর্থহীন। শয়নে-স্বপনে সে কেবল আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আমিই যেন তার সব কিছু। সে আমার প্রেমে আত্মহারা হয়ে একটি কবিতা রচনা করেছে। প্রতিদিন সে বড় আবেগের সাথে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে এ কবিতাখানা পাঠ করে।
সে মনস্থ করেছিলো, আমার রওজার পাশে এসে কবিতাটি পাঠ করবে এবং সরাসরি আমাকে তা শুনাবে। সে যদি এ সুযোগ পেয়ে যায় এবং আমার কবরের পাশে এসে করুণ কণ্ঠে তা পাঠ করতে শুরু করে, তাহলে তার সাথে মুসাফাহা করার জন্য আমাকে অবশ্যই হাত বের করে দিতে হবে।’ তার ফলে পৃথিবীর বুকে ফিতনা ও বিশৃংখলা দেখা দিতে পারে। এ ফিতনার পথ বন্ধ করতেই বলেছিলাম-তাকে মদীনায় আসতে বাধা দাও। অথচ আমার নির্দেশ পেয়ে তুমি তাকে বন্দী করে ফেললে?
স্বপ্ন দেখার সাথে সাথে মক্কার শাসকের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি দ্রৃত কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে জেলখানায় পৌঁছে জামী (রহ.)কে বাইরে নিয়ে এলেন এবং ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর তাঁকে স্বপ্নের পূর্ণ বিবরণ শুনিয়ে ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বিদায় দিলেন।
এ ছিল আল্লামা জামীর নবী প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত
আমরা কি হতে চাই নবীর প্রিয় আশেক? আমরা যদি নবীর একনিষ্ঠ আশেক হতে চাই, তাহলে নবীজীর সুন্নাতের পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে এবং সর্বাবস্থায় নবীজীর প্রতি বেশী বেশী দরূদ শরীফ পাঠ করতে হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ (দঃ) বলেন, ‘‘যে আমার সুন্নাতকে ভালবাসলো, সে আমাকেই ভালবাসলো।” অপর হাদীসে তিনি বলেন, ‘‘যে আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে, সে পরকালে আমার বেশী নৈকট্য লাভ করবে।”
[তথ্যসূত্র: জাফরুল মুহাসসিলীন, ২৩৬ পৃষ্ঠা]
Fida-E-Naqsh-E-Nalainat Kunam Ja, Ya Rasulallah!
ফেদায়ে নকশে নালায়নত কুনাম জা, এয়া রাসুলাল্লাহ
৭.যায়েদ বিন হারেসার ঘটনা
কিশোর সাহাবী হযরত যায়েদ বিন হারেসা রা. মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়ে গোলামরূপে আসার পর তার পিতা কেঁদে কেঁদে তাকে খুঁজে ফিরছিল। এক সময় সন্ধান পেয়ে তার পিতা ও চাচা মদিনায় গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাজির হলো। তারা বিনীত সুরে আরজ করল, হে হাশেম বংশধর! আপনি হারামের অধিবাসী এবং আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। আপনি বন্দী মুক্ত করেন, ক্ষুধার্তদের আহার দান করেন, আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। মুক্তিপণ নিয়ে আমাদের পুত্রকে মুক্ত করে দিন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদের পিতাকে বললেন, আপনি ওকে জিজ্ঞেস করুন, ও যদি যেতে চায় তাহলে আপনারা ওকে নিয়ে যান; মুক্তিপণের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি না যেতে চায় তাহলে আমরা ওর ওপর কোন চাপ প্রয়োগ করতে পারব না। এরপর যায়েদ রা. উপস্থিত হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগন্তুক দু’জনের দিকে ইশারা করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এদের চেন? যায়েদ রা. বললেন হ্যাঁ, ইনি আমার পিতা আর ইনি আমার চাচা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার পরিচয়ও তোমার জানা আছে, সুতরাং এখন তোমার ইচ্ছে মনে চাইলে আমার কাছে থাকতে পার, আর ইচ্ছে হলে তাদের সাথেও যেতে পার। বালক যায়েদ জবাব দিলেন আমি আপনার পরিবর্তে আর কাকেই বা পছন্দ করতে পারি আপনিই তো আমার বাবা-চাচার মতো। বালক যায়েদের এ জবাব শুনে পিতা ও চাচা আবেগ বিহ্বল কণ্ঠে বলে ওঠলেন, যায়েদ! তুমি আজাদির উপর গোলামীকে প্রাধান্য দিচ্ছো?
হযরত যায়েদ রা. বললেন, আমি নবীজির মাঝে এমন সৌন্দর্য দেখেছি, যার বিপরীতে কোন কিছুই পছন্দ করতে পারি না। একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোলে টেনে নিলেন আর বললেন, একে আমি আমার পুত্র বানিয়ে নিলাম। এক কিশোর সাহাবীরও কি গভীর ভালোবাসা ছিল নবীর প্রতি। পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের ভালোবাসাও সেখানে ম্লান হয়ে যায়।
৮. আবু বকরের ঘটনা – :
ইসলামের সূচনালগ্নের কথা। তখন মাত্র ঊনচল্লিশজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতিক্রমে হযরত আবু বকর রা. প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন।
প্রথম যেদিন বক্তৃতা করলেন সেদিনই মুশরিকদের গায়ে আগুন জ্বলে উঠলো, হিংস্র হায়েনার মতো ঝাপিয়ে পড়ল ওরা হযরত আবু বকর রা. এর উপর। ক্ষত- বিক্ষত করে দিলো সারা শরীর।
দীর্ঘ সময় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকলেন তিনি। তারপর সম্বিত ফিরে পাওয়া মাত্রই প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন
প্রিয় নবীজি কেমন আছেন? তার মমতাময়ী মা পুত্রকে কিছু খাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করলেন। কিন্তু হযরতআবু বকর রা. শপথ করে বললেন, নবীজির সাক্ষাত লাভের পূর্বে কোন আহার গ্রহণ করবেন না। এরপর রাতে লোক চলাচল বন্ধ হলে পরম মমতাময়ী মাতা পুত্রকে নিয়ে প্রিয় নবীজির
খেদমতে উপস্থিত হলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম আবু বকর রা. কে দেখে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। হযরত আবু বকরও রা. তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। এভাবে জড়াজড়ি করে তারা উভয়ে খুব
কাঁদলেন, কাঁদলো উপস্থিত সকল মুসলমান। এটাই হলো সত্যিকারের ভালোবাসা। যে ভালোবাসার কাছে খাদ্য, চিকিৎসা এমনকি পরম মমতাময়ী মায়ের স্নেহ- ভালোবাসাও হার মানে!
নবী ও আবুবকর ৩টি জিনিষ ভালোবাসে
একদিন নবী (দ) এরশাদ করলেন (হুব্বিবা ইলাইয়্যা মিন দুনিয়াকুম ছালাছ) দুনিয়াতে আমার ৩টি জিনিষ খুব প্রিয় (১) খুশবু (২) নেককার স্ত্রী (৩) নামাজ
তখন আবু বকর সিদ্দিক বললেন এয়া রাসুলাল্লাহ আমারও ৩টি জিনিষ খুব পছন্দ (১) আপনার চেহেরা দেখা (২) আপনার জন্য খরচ করা (আবু বকর দোয়া করত হে আল্লাহ উপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম আমি দিব আমার নবী নিবে এমন যেন না হয় তাই আমার নবীর দিলে এটা ঢেলে দাও যেন আমার নবী আমার মালকে নিজের মাল মনে করে খরচ করেন।) (৩) আমার মেয়ে আয়শা যে আপনার বিবাহ বন্ধনে আছে।
৯. উহুদ যুদ্ধে আনসারী মহিলা
অহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণ যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তখন এক আনসারী মহিলা যুদ্ধে জড়িত লোকজনের কাছে ব্যাকুল হৃদয়ে জানতে চাইলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেমন আছেন? এক ব্যক্তি বলল, তোমার পিতা শহীদ হয়ে গেছেন। মহিলা শুধু ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ে অসহ্য অস্থিরতায় আবারো জানতে চাইলেন, প্রিয় নবীজি কেমন আছেন? প্রিয় নবীর ভালোবাসার কাছে যেন আপন পিতার শাহাদাতের সংবাদও ম্লান হয়ে যাচ্ছে! এরপর এক এক করে তাঁর স্বামী, ভ্রাতা ও
পুত্রের শাহাদাতের সংবাদ জানানো হল তাঁকে। কিন্তু তিনি ইন্নালিল্লাহি… উচ্চারণ করে বারবার মানুষের কাছে শুধু প্রিয়নবীর কথাই জিজ্ঞেস করছিলেন। এক সময় তিনি শুনতে পেলেন যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালো আছেন। কিন্তু ব্যাকুল হৃদয় তাতেও শান্ত হলো না। এরপর নবীজিকে
স্বচক্ষে দেখেই তবে শান্ত হলেন সেই আনসারী মহিলা। এটাই হলো প্রকৃত নবীপ্রেম। প্রিয়নবীর প্রতি পবিত্র ভালোবাসা। যার উপমা মেলে না এ পৃথিবীতে।
১০. ঘটনা- সবজি বিক্রেতা জাহেয
কুচকুচে কালো সাহাবী হযরত জাহেয রা.। গ্রাম থেকে শাক- সবজি সংগ্রহ করে শহরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। খুব ভালোবাসতেন রাসূল সা. তাঁকে। বলতেন “জাহেয আমাদের গ্রাম আমরা জাহেযের শহর“। একদিন তিনি উদোম শরীরে বাজারে শাক-সবজি বিক্রি করছিলেন। রাসূল সা.
পিছন থেকে এসে তাঁর বোগলের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ঘাড়কে এমন ভাবে ধরলেন যেনো সে নড়তে না পারে।
ধরার সাথে সাথে তিনি স্বজোরে বলতে লাগলেন, এই ! কে ধরেছো আমাকে? ছাড়ো ! ছাড়ো বলছি ! এদিকে রাসূল সা. ও ধরে রেখে বলতে লাগলেন, এই গোলামকে কে ক্রয় করবে……? সুলভ মূল্যে বেঁচে দিবো। রাসূল সা.-এর আওয়াজ শুনে জাহেয রা. চুপ হয়ে গেলেন। রাসূলের গায়ে ছিলো চাঁদর জড়ানো। হাত উঁচু করে জাহেযকে ধরায় রাসূল সা. এর সিনা
মোবারক অনাবৃত হয়ে পড়েছিলো। সুযোগ বুঝে জাহেয রা. নিজের নগ্ন পিঠকে রাসূলের সিনার সাথে মিলিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর রাসূল সা. তাঁকে ছেড়ে দিয়ে
জিজ্ঞেস করলেন, জাহেয ! তুমি চুপ হয়ে গেলে যে? আবার আমার সিনার সাথে তোমার পিঠ ঠেকিয়ে দিলে! জাহেয রা. বললেন, ওগো প্রিয় রাসূল সা.
আমিতো নিঃস্ব । নিতান্তই হতদরিদ্র। কোনো পুঁজি
নেই। হাশরের মাঠে যদি আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করেন, জাহেয! আমার কাছে কি এনেছো তুমি ?
জবাবে বলবো, প্রভূ ! উপস্থাপন করার মতো কিছুই নেই। তবে, আমার পিঠখানা পরীক্ষা করে দেখুন, তাতে তোমার হাবীবের পরশ আছে। একথা শুনে
রাসূল সা. তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আহ্ ! জাহেয রা. তো অন্তত রাসূল সা. এর পরশ পেয়েছেন। আমাদের তো তাও নেই। কোন সম্বল নেই। কোন পুঁজি নেই। রিক্ত হাত। শুন্য থলে। আমরা কী পেশ করবো তাঁর কাছে। আমরা তো এমন হতভাগ্য যে, আমাদের চোখ তাঁর হাবীবকে দেখেনি। এমন দূর্ভাগা আমাদের নাক তাঁর ঘ্রাণ
নিতে পারেনি। এমন বঞ্চিত তাঁর সাথে এক পথে চলতে পারিনি। আমরাতো এমন রিক্ত যে , আমাদের হাত তাঁকে ছুঁতে পারেনি। তবে আমাদের কী হবে? কী
আছে আমাদের? হ্যাঁ আছে। আমাদের অন্তরে মদীনা অলার প্রেম আছে। হৃদস্পন্দনে তাঁর অনুরাগ আছে।
প্রতি রক্তকনিকায় তাঁর ভালোবাসা আছে। মহব্বত আছে। এই প্রেম আর অনুরাগকেই আমরা প্রভুর সামনে পেশ করবো সেদিন। প্রভু অন্তর্যামি। তিনি
দেখেন। বুঝেন। উপলব্ধি করেন
১১. নবীর রাস্তায় কাটাও সহ্য করবনা
হযরত যায়েদ ইবনে দাসানা রা. কাফিরদের হাতে বন্দী হবার পর পাপিষ্ঠরা তাকে শূলে চড়ানোর আয়োজন করে। তামাশা দেখার জন্য সমবেত হয় অনেক লোক। আবু সুফিয়ান তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, যায়েদ! সত্যি করে বলতো; আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদের গর্দান উড়িয়ে দেয়া হোক আর তোমাকে হাসিমুখে তোমার পরিবারের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হোক। হযরত যায়েদ রা. দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! নবীজির যাত্রাপথে একটি কাঁটা লুকিয়ে রাখা হবে আর আমি ঘরে বসে আরাম করবো, এতটুকুও আমার সহ্য হবে না।
হযরত যায়েদের জবাব শুনে সেদিন মক্কার কাফেররা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো। আরব নেতা আবু সুফিয়ান মন্তব্য করেছিলেন, মুহাম্মদের প্রতি তার সাথীদের যে ভালোবাসা আমি দেখেছি, অন্য কারো প্রতি এমন ভালোবাসা আমি আর কখনো দেখিনি।
১২. আবদুল্লাহ বিন উবাই
বনাম জায়েদ বিন আরকাম
# আবদুল্লাহ বিন উবাই (মুনাফিক) যে বাহ্যিক ভাবে হুজুরের কলমা পড়েছে, আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে কিছুটা বাক বিতন্ডা হল, আবদুল্লাহ বিন উবাই বলল আমরা সম্মানিতরা গিয়ে মদীনা থেকে অপদাথদের বের করে দিব। এ কথা হযরত জায়েদ বিন আরকম শুনে তা হুজুরকে জানালেন, আবদুল্লাহ বিন উবাই হুজুরের পিছনে নামাজও পড়ত, কলমা পাঠকারী মুসলমানও ছিল, কিন্তু তার অন্তরে হুজুরের প্রতি মহব্বত ইজ্জত ছিলনা।
আমাদের নবী আবদুল্লাহ বিন উবাইকে ডাকলেন এবং তার কাছে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাই অস্বীকার করল আর কসম করে বলল আমি এ কথা বলিনি, যদি আমি বলে থাকি তাহলে জায়েদ বিন আরকামকে বলুন যেন স্বাক্ষী উপস্থিত করে, কিন্তু জায়েদ বিন আরকামের কাছে কোন স্বাক্ষি ছিলনা, তখন বিষয়টি আবদুল্লাহ বিন উবাই এর পক্ষে চলে গেল, তখন জায়েদ বিন আরকাম সাওয়ারিতে করে ঘরে চলে যাচ্ছিলেন, মনটা খুবেই খারাপ, মাথা ঝুকিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, কিছুদুর যাওয়ার পর দেখেন হুযুর অন্য একটি সওয়ারী নিয়ে জায়েদ এর সাওয়ারির পাশে আসলেন, হযরত জায়েদ বলেন হুযুর আমার কান ধরে আমার চেহেরা হুজুরের দিকে ফিরালেন আর মুচকি হেসে দিলেন, জায়েদ বিন আরকাম বলেন হুজুর এর এই হাসিতে আমি এত খুশি হয়েছি যে আমার জীবনে আমি এত খুশি কখনো অনুভব করিনি।
১৩. কেয়ামত কখন হবে?
কোনো এক ব্যক্তি হুজুর পাক (দ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ (দ)! শেষ বিচার দিবস কখন হবে”? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ”? ওই ব্যক্তি জবাব দিলেন, “কিছুই না; তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি।” অতঃপর মহানবী (দ) এরশাদ ফরমালেন- “তুমি যাদের ভালোবাস, তাঁদের সাথে থাকবে।” এই হাদীসের রেওয়ায়েত কারী হযরত আনাস (রা:) বলেন, ‘রাসূলে খোদা (দ)-এর ওই কথা শুনে আমরা যতো খুশি হয়েছিলাম তাঁর চেয়ে বেশি খুশি আগে কখনো হই নি। অতএব, আমি হুজুর পূর নূর (দ), হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত ওমর (রা:)-কে ভালোবাসি এবং আশা করি যে এর ফলে আমি তাঁদের সঙ্গে থাকবো, যদিও আমার আমল তাঁদের মতো নয়।”
১৪. জান্নাতে কি আপনাকে দেখব?
একবার কেউ একজন রাসূলুল্লাহ (দ)-এর কাছে এসে আরয করলেন, “হে আল্লাহর নবী! আমি আপনাকে আমার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আমি আপনাকে স্মরণ করি এবং আপনার কাছে এসে আপনাকে দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে পারি না। আমি জানি আমি পরলোকবাসী হবো এবং আপনিও বেসালপ্রাপ্ত হবেন; এও জানি আপনি তখন বেহেশতে (নবীকুল সরদার হিসেবে) নবীদের সাথে উচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত হবেন। তখন তো জান্নাতে আপনার দেখা পাবো না।” এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা’লা আয়াত নাযেল করলেন-
وَمَن يُطِعِ اللّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَـئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاء وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَـئِكَ رَفِيقًا
“এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও রাসূল (দ)-এর হুকুম মান্য করে, তবে সে তাঁদের সঙ্গ লাভ করবে যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন- অর্থাৎ নবীবৃন্দ, সত্যনিষ্ঠ বুযূর্গানে দ্বীন, শাহাদাৎপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সৎ-কর্মপরায়ণ মানবকুল। এঁরা কতোই উত্তম সঙ্গী” (সূরা নিসা, ৬৯ আয়াত)!
মহানবী (দ) ওই ব্যক্তিকে ডেকে উপরোক্ত আয়াতে করীমা তেলাওয়াত করে শুনালেন। (তাবারানী)
# সাহাবাগন নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন, নবীর জন্য জান মাল ধন সম্পদ সব বিলিয়ে দিয়েছেন তবুও হুজুরের হক আদায় করতে পারেনি।
১৫. আয়শা (রা) এর জন্য নবীর দোয়া এবং আমাদের জন্য নবীর দোয়া
একদিন মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা রাসূলে আকরাম ﷺ সাথে ছিলেন ।
রাসূল ﷺ কে বেশ উৎফুল্ল দেখে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন । রাসূল ﷺ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার জন্য দোয়া করলেন । "হে আল্লাহ আয়েশাকে মাফ করে দাও । তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দাও, তার আগামীর গুনাহ মাফ করে দাও, তার গোপনে করা গুনাহ মাফ করে দাও, তার প্রকাশ্যে করা গুনাও মাফ করে দাও ।
" রাসূল ﷺ দোয়া শুনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হাসলেন । তিনি এত হাসলেন যে হাসতে হাসতে রাসূল (ﷺ) এর কোলে মাথা রাখলেন। সুবহানআল্লাহ।
রাসূল ﷺ আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার এই দোয়া কি তোমাকে আনন্দিত করেছে ? আয়েশা (রাঃ) বললেন, কি করে এমন দোয়া কাউকে সন্তুষ্ট করতে না পারে !
আমাদের প্রিয় নবী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে বললেন, আল্লাহর কসম ! আমি আমার উম্মতের জন্য আমার প্রতিটি নামাজে এই একই দোয়া করি ।
যে দোয়া রাসূল ﷺ উনার প্রিয়তম স্ত্রীর জন্য করেছেন সেই একই দোয়া প্রতি নামাজে তিনি তাঁর উম্মতের জন্য করেছেন, আপনার জন্য, আমার জন্যও করেছেন । তিনিই আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ।
-
#একদিন চলার পথে রাসূল ﷺ কেঁদে উঠলেন । সাহাবারা কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি আমার ভাইদের জন্য কাঁদছি । সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমরা কি আপনার ভাই নই ? রাসূল ﷺ তোমরা তো আমার সাথী । আমার ভাই হল তারা যারা আমার পরে আসবে আর আমাকে না দেখেই আমার উপর ঈমান আনবে ।
আপনি এই দুনিয়াতে আসার আগেই রাসূল ﷺ আপনার জন্য কেঁদেছেন, আপনাকে মিস করেছেন । আমি আপনি কি কখনও প্রিয় নবীকে মিস করেছি? কেঁদেছি কখনও ? যে নবী আমার আপনার জন্য প্রতি ওয়াক্ত নামাজে দোয়া করতেন, সেই নবীর নামে দরুদ পড়েছি কয়দিন ? ভালোবেসে কোনদিন তার কয়টা সুন্নাহ পালন করেছি আমরা ?
ভালবাসার চিহ্ন কি?
১৬। সাহাবী আবুদ দাহদা ও খেজুর বাগানের ঘটনা
মদীনার বাগানগুলোর মধ্যে এক ইয়াতীম ছেলের একটি বাগান ছিল। তার বাগানের সাথে লাগোয়া বাগানের মালিক ছিলেন আবু লুবাবা নামের এক লোক। সেই ইয়াতীম ছেলেটি নিজের বাগান বরাবর একটি প্রাচীর দিতে গিয়ে দেখল, প্রতিবেশীর একটি খেজুর গাছ সীমানার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেটি তার প্রতিবেশীর কাছে গিয়ে সমস্যার কথা বলে সীমানার খেজুর গাছটি কিনতে চাইলো যাতে প্রাচীরটি সোজা হয়। কিন্তু প্রতিবেশী আবু লুবাবা কোনভাবেই রাজী হচ্ছিল না।
কোন উপায় না পেয়ে সেই ইয়াতীম রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বললো। আল্লাহর রাসুল ﷺ ডেকে পাঠালেন আবু লুবাবাকে। সে মসজিদে নববীতে আসলে নবী করীম ﷺ সেই খেজুর গাছটি অর্থের বিনিময়ে হলেও ইয়াতীম ছেলেটিকে দিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন।
আবু লুবাবা যথারীতি রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক পর্যায়ে তাকে বললেন, "তোমার ভাইকে ওই খেজুর গাছটি দিয়ে দাও। আমি তোমার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছের জিম্মাদার হব।"
বিস্ময়কর হলেও আবু লুবাবা তারপরেও সেই খেজুর গাছ দিতে রাজী হলো না। রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এই পর্যায়ে চুপ হয়ে গেলেন। এর চেয়ে বেশী তিনি ﷺ তাকে আর কী বলতে পারেন!
উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে সাবিত (রাঃ)ও ছিলেন। তিনি আবু দাহদাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মদীনায় তাঁর খুব সুন্দর একটি বাগান ছিল। প্রায় ৬০০ খেজুর গাছ ছাড়াও একটি মনোরম বাড়ি ও একটি পানির কুয়া ছিল সেখানে। মদীনার সব বড় ব্যবসায়ীদের কাছে আবু দাহদাহ (রাঃ) এর বাগানটি সুপরিচিত ছিল। তিনি স্বপরিবারে সেখানে বসবাসও করতেন।
আবু দাহদাহ (রাঃ) হঠাৎ রাসুলুল্লাহ্ ﷺ -এর কাছে গিয়ে বললেন, `হে আল্লাহ্`র রাসুল ﷺ ! আমি যদি আবু লুবাবার কাছ থেকে ঐ খেজুর গাছটি কিনে এই ইয়াতীমকে দিয়ে দেই, তাহলে আমিও কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হবো?` রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, "হ্যাঁ, তোমার জন্যও জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে।" আবু দাহদাহ (রাঃ) সাথে সাথে আবু লুবাবাকে বললেন, `আপনি আমার সেই সম্পূর্ণ বাগানটি গ্রহণ করে সেই খেজুর গাছটি আমাকে দিয়ে দিন।`
আবু লুবাবা `দুনিয়াবী` এই বিনিময় বিশ্বাস করতে পারছিল না! হুঁশ ফিরলেই সে বলল, `হ্যাঁ আমি আপনার খেজুর গাছের বাগানটি গ্রহণ করলাম। বিনিময়ে আমার সেই খেজুর গাছটি আপনাকে দিয়ে দিলাম।`
হযরত আবু দাহদাহ (রাঃ) সেই মূহুর্তেই খেজুর গাছটি ইয়াতীম ছেলেটিকে উপহার হিসাবে দিয়ে দিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এর দিকে তাকিয়ে বললেন, `হে রাসুলুল্লাহ্ ﷺ ! এখন আমি কি জান্নাতে একটি খেজুর গাছের মালিক হলাম`? রাসুলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, "আবু দাহদাহ`র জন্য জান্নাতে এখন কত বিশাল বিশাল খেজুরের বাগান অপেক্ষা করছে।"
বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, এ কথাটি রাসুলুল্লাহ্ ﷺ এক, দুই বা তিনবার বলেননি; বরং খুশী হয়ে বারবার বলেছেন।
শেষে আবু দাহদাহ (রাঃ) সেখান থেকে বের হয়ে সদ্য বিক্রি করে দেয়া সেই বাগানে ফিরে গেলেন। বাড়ির দরজায় এসে স্ত্রীকে ডাক দিলেন তিনি, `হে উম্মে দাহদাহ! বাচ্চাদেরকে নিয়ে এ বাগান থেকে বের হয়ে আসো। আমি দুনিয়ার এই বাগান বিক্রি করে দিয়েছি`। তার স্ত্রী বললেন, `আপনি কার কাছে এটি বিক্রি করেছেন? কে কত দাম দিয়ে এটি কিনে নিয়েছে?`
আবু দাহদাহ (রাঃ) বললেন, `আমি জান্নাতে একটি খেজুর বাগানের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দিয়েছি`। তাঁর স্ত্রী বললেন, `আল্লাহু আকবার! হে আবু দাহদাহ! আপনি অবশ্যই অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা করেছেন`।
[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৫০৪; ইবনে হীব্বান, হাদীস ৭১৫৯; আস-সিলসিলা সাহীহাহ, হাদীস ২৯৬৪; মুস্তাদরাকে হাকীম, হাদীস ২১৯৪]
এভাবেই সাহাবীরা নবীকে খুশী করার জন্য রাজি করার জন্য জান মাল কুরবান করে দিয়েছেন, দুনিয়ার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, মা, বাবা, ভাই বোন, আত্মিয় স্বজন, ধন সম্পদ টাকা পয়সা জায়গা জমি এমনকি নিজেদের জানের চেয়েও নবীকে বেশী ভালোবাসতে হবে, আর সে ভালোবাসা শিখিয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম বুযুর্গানে দ্বীন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে নবীর প্রতি নিজেদের প্রাণের চেয়ে বেশী ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিন আমিন।

কোন মন্তব্য নেই