বাবরি মসজিদে প্রথম আঘাতকারী বলবির সিংয়ের কী হয়েছিল?

 বাবরি মসজিদে প্রথম আঘাত: বলবীর সিং থেকে মোহাম্মদ আমির—অনুশোচনা ও আত্ম-শান্তির সন্ধানে এক জীবন


১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং শিব সেনা পার্টির সমর্থকরা অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে, তখন সেই কলঙ্কজনক ঘটনার প্রধান চরিত্রদের মধ্যে ছিলেন দুই তরুণ—বলবীর সিং এবং যোগেন্দ্র পাল। দুজনেই ছিলেন শিবসেনার সক্রিয় কর্মী। সেদিন রাম মন্দিরের ধোঁয়া তুলে মসজিদ ভাঙার সময় বলবীর সিং ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কোদাল হাতে সবার আগে মসজিদের মাঝের গম্বুজটিতে আঘাত করেছিলেন এবং ভগবান রামের নামে জোরে জোরে ধ্বনি দিয়েছিলেন।

বাবরি ধ্বংসের পর পানিপথে ফিরে বলবীর সিং সংবর্ধনা পান এবং স্থানীয়দের কাছে নায়ক বনে যান। এমনকি শিবসেনার অফিসে মসজিদের চুড়া থেকে আনা দুটি ইট সাজানোও হয়েছিল। কিন্তু এই বাহবা শেষ কথা ছিল না, যা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি। বাড়ি ফেরার পর তার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়।

বাবার শোক ও বন্ধুর করুণ পরিণতি

বলবীরের বাবা দৌলতরাম ছিলেন একজন গান্ধীবাদী এবং উগ্র হিন্দু ছিলেন না; তিনি সবসময় আশপাশের মুসলমানদের আগলে রাখতেন। বলবীর যখন মসজিদ ভেঙে বাড়ি ফিরলেন, তখন তার বাবা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দৌলতরাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এ বাড়িতে হয় বলবীর থাকবেন, না হয় তিনি থাকবেন। রাগে-ক্ষোভে তিনি বাড়ি ছেড়ে যেতে উদ্যত হলে, বলবীর নিজেই বাড়ি ছাড়েন। তার স্ত্রীও তার সঙ্গে যেতে রাজি হননি, ফলে পুরনো জীবনের সঙ্গে তার সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

এরপর শুরু হয় অনিশ্চিত এবং একাকী জীবন। ভবাঘুরের মতো ঘুরে বেড়াতেন বলবীর এবং লম্বা দাড়িওয়ালা কোনো মুসলিম দেখলে ভয় পেতেন। এই দিনগুলোর মধ্যে তিনি শুনতে পান যে তার বাবা আর নেই। বাবরি ভাঙার দুঃখেই তার মৃত্যু হয়েছে—এ কথা শুনে বলবীর গভীরভাবে ভেঙে পড়েন।

অন্যদিকে, তার বন্ধু যোগিন্দর পাল, যিনি মসজিদ হামলায় সহযোগিতা করেছিলেন, বলবীর চলে আসার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। যোগিন্দর উলঙ্গ থাকতে শুরু করেন এবং অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে শেকলে বেঁধে রাখা হয়। তবে বলবীর পরে আরও বিস্ময়কর এক সত্য জানতে পারেন: যোগিন্দরও মানসিক অস্থিরতা থেকে পরিত্রাণ এবং পাপ মোচনের জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। যোগিন্দরের এই পরিণতি এবং বাবার মনোকষ্ট বলবীরকে বারবার ইসলামের দিকে ডাকতে থাকে।

ইসলাম গ্রহণ ও প্রায়শ্চিত্তের পথে

১৯৯৩ সালের ৯ মার্চ তার বাবার মৃত্যু হয়। বাবার দুঃখ এবং যোগিন্দরের করুণ পরিণতি থেকে জন্ম নেওয়া অপরাধবোধ বলবীরকে খুঁড়ে খুঁড়ে খেতে থাকে। ফলস্বরূপ, ১৯৯৩ সালের ২৫ জুন যোহর নামাযের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পথে গিয়ে মাওলানা কালীন সিদ্দিকীর কাছে দীক্ষা নেন তিনি।

বলবীর সিং থেকে তার নতুন পরিচয় হয় মোহাম্মদ আমির বা মুহাম্মদ আমের। বর্তমানে তিনি একজন পরিপূর্ণ মুসলিম। তার মুখে লম্বা দাড়ি, মাথায় টুপি এবং গায়ে আলখেল্লা দেখা যায়। তিনি কথায় কথায় 'আল্লাহু আকবার' এবং 'আলহামদুল্লিাহ' বলেন। তিনি ভোরে ফজরের আজান দেন ('আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম') এবং আল্লাহর জিকিরে শান্তি খুঁজে পান।

বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে মোহাম্মদ আমির একটি বিশেষ প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়া ১০০টি মসজিদ সংস্কার করবেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মেওট/মেওয়াত এলাকায়, বহু জীর্ণ মসজিদ খুঁজে বের করে স্থানীয় মুসলিমদের সহায়তায় সেগুলো মেরামত করেছেন।

বলবীর সিং থেকে মোহাম্মদ আমিরের এই রূপান্তর শুধু ধর্ম পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি গভীর অনুতাপ, অপরাধবোধ এবং আত্মিক শান্তির সন্ধানের এক নাটকীয় গল্প। যে দুজন বাবরি মসজিদ ভাঙার পথে একই সঙ্গে হেঁটেছিলেন, পরিণতিতে তাদের পথই দুজনকে দিয়ে গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়। এক দিনের মসজিদ ধ্বংসকারী আজ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়া মসজিদ মেরামতের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন

কোন মন্তব্য নেই

borchee থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.