আযানের সময় যারা টয়লেট করন তারা শুনুন!! ৯৯% লোক জানেনা
আযানের সময় যারা টয়লেট করন তারা শুনুন!! ৯৯% লোক জানেনা
আযানের ফজিলত, শিষ্টাচার এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামে আযান হলো মহান আল্লাহর একত্ববাদ এবং নামাজের প্রতি আহ্বানের এক সুমধুর ধ্বনি। দিনে পাঁচবার এই ধ্বনির মাধ্যমে মুমিনদেরকে দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততা ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকা হয়। আযান শুধুমাত্র একটি আহ্বান নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে অসীম সওয়াব, গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার এবং চমৎকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
আপনার জানতে চাওয়া বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে আযান সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ নিচে তুলে ধরা হলো:
আযানের ফজিলত
আযান দেওয়া এবং আযানের জবাব দেওয়া উভয় কাজই ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসের আলোকে আযানের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ফজিলত হলো:
কেয়ামতের দিন বিশেষ মর্যাদা: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "কেয়ামতের দিন মুয়াজ্জিনদের ঘাড় সবচেয়ে দীর্ঘ হবে" (অর্থাৎ তারা বিশেষ সম্মানের অধিকারী হবেন)।
ক্ষমা লাভ: মুয়াজ্জিনের কণ্ঠস্বর যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং যারা তার আযান শুনে নামাজে অংশগ্রহণ করে, তাদের সমপরিমাণ সওয়াব মুয়াজ্জিনও লাভ করেন।
শাফায়াত লাভ: যে ব্যক্তি আযানের জবাব দেয় এবং আযান শেষে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর দরুদ পড়ে নির্দিষ্ট দোয়াটি পাঠ করে, তার জন্য কেয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শাফায়াত অবধারিত হয়ে যায়।
আযানের সময় শয়তান কি করে?
আযানের ধ্বনিতে আল্লাহর মহিমা এত প্রবলভাবে উচ্চারিত হয় যে, শয়তান তা সহ্য করতে পারে না।
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, যখন নামাজের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান সজোরে বায়ু নির্গত করতে করতে এত দূরে পালিয়ে যায় যেন সে আযানের শব্দ শুনতে না পায়।
আযান শেষ হলে সে আবার ফিরে আসে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য।
এরপর যখন নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয়, তখন সে আবারও পালিয়ে যায় এবং ইকামত শেষ হলে ফিরে এসে নামাজরত ব্যক্তির মনে নানা রকম চিন্তার উদ্রেক ঘটায়।
আযানের সঠিক জবাব দেওয়ার নিয়ম
আযান শোনার পর মুয়াজ্জিন যা বলেন, শ্রোতার জন্য হুবহু তা-ই বলা সুন্নত। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম ও নিয়ম রয়েছে:
মুয়াজ্জিন যখন "হাইয়া আলাস-সালাহ" (নামাজের দিকে এসো) এবং "হাইয়া আলাল-ফালাহ" (কল্যাণের দিকে এসো) বলবেন, তখন শ্রোতাকে বলতে হবে: "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ থেকে বাঁচার বা পুণ্য করার কোনো ক্ষমতা নেই)।
ফজরের আযানে মুয়াজ্জিন যখন "আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম" (ঘুম হতে নামাজ উত্তম) বলেন, তখন শ্রোতাও জবাবে ঠিক এই বাক্যটিই বলবেন (এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত)।
আযান শেষ হওয়ার পর প্রথমে রাসূল (সাঃ)-এর উপর দরুদ পাঠ করতে হয় (যেমন: দরুদে ইব্রাহিম)।
এরপর আযান শেষের নির্দিষ্ট দোয়া (আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ...) পাঠ করতে হয়।
টয়লেটে থাকা অবস্থায় আযান শুনলে করণীয়
টয়লেট বা বাথরুম হলো অপবিত্র স্থান, যেখানে মুখে উচ্চারণ করে আল্লাহর নাম নেওয়া বা যিকির করা সম্পূর্ণ নিষেধ।
যদি কেউ টয়লেটে থাকা অবস্থায় আযানের শব্দ শুনতে পান, তবে তিনি মুখে উচ্চারণ করে আযানের জবাব দেবেন না।
এই সময়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকতে হবে। তবে মনে মনে আযানের শব্দগুলোর স্মরণ করা যেতে পারে (ঠোঁট ও জিহ্বা না নাড়িয়ে)।
টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর যদি আযানের সময় বাকি থাকে, তবে তখন জবাব দেওয়া এবং দোয়া পড়া যেতে পারে।
ইসলামে রাসূল (সাঃ) এর ২ জন মুয়াজ্জিনের বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে মসজিদে নববীতে মূলত দুইজন বিখ্যাত সাহাবী নিয়মিত মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন:
১. হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ): তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন। তাঁর সুমিষ্ট ও উদাত্ত কণ্ঠস্বরের জন্য রাসূল (সাঃ) তাকে আযান দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আবিসিনিয়ান (ইথিওপিয়ান) দাস, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেও ঈমানে অটল ছিলেন।
২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ): তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টিহীন সাহাবী। হযরত বেলাল (রাঃ)-এর পাশাপাশি তিনিও মসজিদে নববীতে আযান দিতেন। বিশেষ করে রমজান মাসে এবং ফজরের নামাজের সময় তাদের দুজনের আযানের সময়সূচির একটি বিশেষ সমন্বয় ছিল।
মক্কায় তাহাজ্জুদের আযানের রহস্য
মক্কায় (মসজিদুল হারাম) এবং মদিনায় (মসজিদে নববী) ফজরের মূল আযানের বেশ কিছুক্ষণ আগে আরও একটি আযান দেওয়া হয়, যাকে অনেকেই "তাহাজ্জুদের আযান" বলে থাকেন। এর পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সুন্নত ও যৌক্তিক রহস্য:
রাসূল (সাঃ) এর যুগের সুন্নত: রাসূল (সাঃ)-এর সময়ে রমজান মাসে হযরত বেলাল (রাঃ) রাতের শেষ ভাগে (সাহরির সময়) প্রথম আযানটি দিতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল যারা ঘুমাচ্ছে তাদের জাগিয়ে দেওয়া, যারা তাহাজ্জুদ পড়ছে তাদের সাহরি খাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
ফজরের প্রস্তুতি: হযরত বেলাল (রাঃ)-এর আযানের পর সাহাবীরা সাহরি খেতেন। এরপর যখন সুবহে সাদিক (ভোর) হতো, তখন অন্ধ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) ফজরের মূল আযান দিতেন, যার পর থেকে খাওয়া-দাওয়া নিষিদ্ধ এবং ফজরের ওয়াক্ত শুরু হতো।
বর্তমান আমল: মক্কা ও মদিনায় আজ পর্যন্ত রাসূল (সাঃ)-এর সেই সুন্নতকে ধারণ করে ফজরের আগে এই প্রথম আযানটি দেওয়া হয়। এটি মূলত মানুষকে ঘুম থেকে জাগানো, তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা এবং ফজরের নামাজের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার একটি সতর্কতামূলক আহ্বান।
আযানের এই প্রতিটি বিধান ও সুন্নত মুসলমানদের জীবনে শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।


কোন মন্তব্য নেই