মৃত মা বাবার জন্য করণীয়। মা বাবার জন্য সন্তানের শ্রেষ্ঠ উপহার
মৃত মা বাবার জন্য করণীয়। মা বাবার জন্য সন্তানের শ্রেষ্ঠ উপহার
মা বাবার সাথে তোমার ব্যবহার আচর এমন এক কাহিনি যা তুমি নিজে লিখ আর তোমার সন্তানরা তা তোমাকে পড়ে শুনাবে। অর্থ্যাৎ মা বাবার সাথে তুমি যেমন আচরন করবে তোমার সন্তানরা তোমার সাথে তেমনটিই করবে।
যদি বে আমল বা আমল না করে যে সব মা বাবা দুনিয়া থেকে মৃত্যু বরণ করেছেন, তারা দুনিয়ায় থাকতে তেমন কোন আমল করেননি, এখন সন্তান হিসেবে তাঁদের জন্য কি করবেন?
প্রথমত- বেশী বেশী দোয়া করবেন- মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে,
رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤]
‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪]
رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]
‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীমঃ৪১]
এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ
رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨
‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] ।
মা-বাবা এমন সন্তান রেখে যাবেন যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ».
অর্থ: মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-১. সদকায়ে জারিয়া ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দু‘আ করে [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০]
দ্বিতীয়তঃ প্রতি জুমাবার জুমার পর মৃত পিতা মাতার কবর যেয়ারত করবেন। মনে রাখবেন সপ্তাহে অন্তত ১ বার পিতার মাতার কবর যেয়ারত করা এটা মৃত পিতা মাতার সাথে অনেক বড় ধরনের ভাল আচরন। আপনি ভাবতে পারেন এতে কি ফায়দা? নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেন জেয়ারতের ফলে মৃতরা খুব বেশী উৎফুল্ল হন, শান্তি পান, কবর পারে গিয়ে কুরান তেলাওযাত করবেন দোয়া করবেন, এমন নয় যে মরার পর তাদের কবর সুন্দর করলেন, পাকা করলেন, টাইলস লাগিয়ে দিলেন এরপর আর কবরের ধারে কাছেও গেলেন না এমনটা করা উচিত নয়। বরং রেগুলার কবরে আসবেন তাদের জন্য দোয়ায়ে মাগফেরাত করবেন বেশী বেশী।
তৃতীয়তঃ তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়া করবেন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে দেয়া, মসজিদে পাখা দান করে দেয়া, মা বাবার ইছালে ছাওয়ারে নিয়তে মসজিদে কার্পেট দান করা, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা, সম্ভব হলে একজন ছাত্রের ভরনপোষন লেখাপড়ার খরচ বহন করে তাঁকে আলেম বানিয়ে দেন সে আলেম হয়ে যতদিন ইসলামের খেদমত করবে ততদিন তার ছাওয়াব আপনার পিতা মাতার কবরে পৌঁছতে থাকবে। এভাবে ছাওয়াবে জারিয়া করে দিবেন। পিতা মাতার আত্মিয় বন্ধু বান্ধবের সাথে ভাল আচরন করবেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার মা হঠাৎ মৃতু বরণ করেছেন। তাই কোন অছিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-ছাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে ছাদকা করলে তিনি কি এর ছাওয়াব পাবেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৭৩]
তাছাড়া মৃত মা বাবার জন্য হজ্ব ওমরা করা, নফল রোজা রাখার দ্বারাও তাদের ফায়দা পৌঁছানো যায়।
চতুর্থত: মা বাবা যদি বে আমল হয় তাহলে তাদের হায়াতের ১৫ বছর বাদ দিয়ে বাকী বয়সের হিসাব করবেন মোটামোটি রোজা নামাজ যে করেননি তার একটা আনুমানিক হিসাব করে সেটার ফিদিয়া দিয়ে দিবেন। আর ফিদিয়া হল প্রতি ওয়াক্ত নামাজের বদলায় ১টি সদকায়ে ফিতরার সমপরিমান, আর প্রতিটি ফরয রোযার বদলায় ১টি সদকায়ে ফিতরার সমপরিমান ফিদিয়া দিয়ে দিবেন। সব একসাথে দিতে না পারলে অল্প অল্প করেও নামাজ রোযার ফিদিয়া সদকা করতে পারবেন
পঞ্চমত-মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهً حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ».
অর্থ: ‘‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]
ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয় । হাদীসে আরো এসেছে,
«مَا دَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْضَى دَيْنُهُ»
অর্থ: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮; মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]
তাছাড়া মা বাবার কোন কাফফারা বাকী থাকলে তা আদায় করা,
কোন মান্নত করে থাকলে সে মান্নত পুরণ করে দেয়া,
মা বাবা কোন ভালো আমল করলে তা জারি রাখা,
কারো সাথে কোন ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা,
কোন গুনাহের কাজ চালু করলে তা বন্ধ করা।
মা বাবা কারো উপর জুলুম করলে মৃত মা বাবার পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া।
তাছাড়া পিতা মাতার হায়াতে যদি সন্তান মা বাবার সাথে খারাপ আচরন করে এখন মা বাবার মৃত্যুর পর সন্তান যদি তার ভুল বুঝতে পারে তাহলে সেও তার পিতা মাতার জন্য এসব কাজ করতে পারে আশা করা যায় কেয়ামতের ময়দানে সে সন্তান পিতা মাতার ফরমাবরদার হিসেবে উত্থিত হবে। এবং পিতা মাতাও যদি বেআমল হয় আশা করা যায় আপনার এসব আমলের ফলে তারাও উপকৃত হবে।

কোন মন্তব্য নেই